Voice of Insaf: ‘স্মৃতির টানে প্রিয় প্রাঙ্গণে, এসো মিলি প্রাণের বন্ধনে’ এই একটিমাত্র পঙ্ক্তিই যেন ভাষা হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) সবুজ প্রাঙ্গণে। প্রায় তিন দশক আগে গড়ে ওঠা বন্ধুত্ব, অজস্র স্মৃতি আর যৌবনের দিনগুলোর টান উপেক্ষা করতে না পেরে দেশ-বিদেশের নানা প্রান্ত থেকে ছুটে এসেছেন ১৯৯৬–৯৭ শিক্ষাবর্ষের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা। আনন্দ, আবেগ আর স্মৃতিচারণায় ভর করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে শুরু হয়েছে তাদের দুই দিনব্যাপী পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান।
শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) বেলা ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের হেলিপ্যাডের সামনে বেলুন উড়িয়ে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করা হয়। এরপর প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে বের হয় এক বর্ণাঢ্য র্যালি। র্যালিটি হেলিপ্যাড থেকে শুরু হয়ে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে দিয়ে কে.আর মার্কেট প্রদক্ষিণ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ সড়কসমূহ অতিক্রম করে সমাবর্তন চত্বরে এসে শেষ হয়।
এসময় বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে আর বাঁশির সুরে পুরো ক্যাম্পাস যেন ফিরে যায় নব্বইয়ের দশকে। যখন প্রতিটি দিন ছিল তারুণ্যের উচ্ছ্বাসে ভরা।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল আলীম, পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানের আহ্বায়ক ড. মো. বজলুর রহমান মোল্ল্যা এবং ওই ব্যাচের শিক্ষার্থীসহ তাদের পরিবার-পরিজন ও সন্তানরা।
পুনর্মিলনীর প্রথম দিন বিকেলে ‘ কৃষিতে ড্রোন এবং স্যাটেলাইট প্রযুক্তির ব্যবহার’ শীর্ষক একটি সেমিনারের আয়োজন করা হয়েছে। সন্ধ্যা নামতেই শুরু হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, যেখানে সংগীত পরিবেশন করবেন জনপ্রিয় শিল্পী লুইপা ও পুলক। পাশাপাশি দিনব্যাপী নারী ও পুরুষদের জন্য বিভিন্ন গেমস ও বিনোদনমূলক আয়োজন রাখা হয়েছে।
পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানের আহ্বায়ক ড. মো. বজলুর রহমান মোল্ল্যা বলেন, “এটি দুই দিনব্যাপী একটি আবেগঘন আয়োজন। দেশ-বিদেশ থেকে অনেক বন্ধু এখানে এসেছেন। এমন অনেকের সঙ্গে দেখা হয়েছে, যাদের ২৫ বছর পর দেখছি। মনে হচ্ছে আমরা আবার সেই প্রথম বর্ষে ফিরে গেছি। সবার চোখেমুখে উচ্ছ্বাস আর আনন্দ স্পষ্ট। অনেকেই পরিবারসহ এসেছেন, সন্তানদের সঙ্গে নিয়ে মিলনমেলা উপভোগ করছেন।”
পুরোনো দিনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন শিমা হালদার। তিনি বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ে আসলে আমার সবসময়ই ভালো লাগে। তবে এবারের ভালো লাগাটা অন্যরকম। মনে হচ্ছে আমি আবার সেই প্রথম বর্ষের ছাত্রী। পুরোনো বন্ধুদের দেখে সত্যিই আবেগ ধরে রাখা কঠিন। বয়স যে পঞ্চাশ পেরিয়েছে, তা যেন মনেই হচ্ছে না। পরিবারের সদস্যরাও সঙ্গে এসেছে, ছোট বাচ্চারা ক্যাম্পাসে দৌড়াদৌড়ি করছে। সব মিলিয়ে এক অনন্য অনুভূতি। এই সুন্দর আয়োজনের জন্য আয়োজকদের আন্তরিক ধন্যবাদ।”
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল আলীম বলেন, “বছরের পর বছর বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হয় না। এই পুনর্মিলনী সেই শূন্যতা পূরণ করার একটি সুন্দর উপলক্ষ। আয়োজকরা অত্যন্ত সুন্দরভাবে পুরো অনুষ্ঠান সাজিয়েছেন। এতে ক্যাম্পাসে এক আবেগঘন ও প্রাণবন্ত পরিবেশ তৈরি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।”
এসময় তিনি ১৯৯৮–৯৯ ব্যাচের পুনর্মিলনীতে অংশগ্রহণ করতে এসে সদ্য প্রয়াত আবু সাদাত সায়েমকে স্মরণ করেন। তিনি বলেন,
“গত শুক্রবার পুনর্মিলনীতে এসে আমাদের এক বন্ধু, সায়েম, না ফেরার দেশে চলে গেছেন। তার জন্য আমরা সবাই দোয়া করি। আপনারা কেউ কোনো ধরনের অসুবিধা বা খারাপ লাগা অনুভব করলে কর্তৃপক্ষকে জানাবেন। শান্তিপূর্ণ ও আনন্দঘন পরিবেশ বজায় রাখার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।”
স্মৃতি, বন্ধুত্ব আর ভালোবাসার বন্ধনে বাঁধা এই পুনর্মিলনী যেন প্রমাণ করলো, সময় অনেক কিছু বদলে দিলেও, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সম্পর্ক আর অনুভূতিগুলো আজও ঠিক ততটাই অটুট।
মো. লিখন ইসলাম
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ।