Voice of Insaf: বান্দরবানের পাহাড়ঘেরা নির্বাচনী পরিবেশে এবার ৩০০ নম্বর সংসদীয় আসনে রাজনৈতিক সমীকরণ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের ভূ-রাজনীতিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের এই জেলাটি সব সময়ই বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এবারের নির্বাচনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী সাচিং প্রু জেরী, এনসিপির আবু সাঈদ শাহ্ সুজাউদ্দিন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মাওলানা মো. আবুল কালাম আজাদ এবং জাতীয় পার্টির (কাদের) আবু জাফর মোহাম্মদ ওয়ালিউল্লাহর অংশগ্রহণ নির্বাচনের আমেজে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। পাহাড়ের মানুষের ভাগ্য উন্নয়ন, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা এবং এই অঞ্চলের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি পর্যটন শিল্পকে কেন্দ্র করেই মূলত এবারের নির্বাচনী লড়াই আবর্তিত হচ্ছে।
বান্দরবানের রাজনীতি মূলত আঞ্চলিক শান্তি এবং উন্নয়নের ওপর নির্ভরশীল। দীর্ঘ সময় ধরে এই আসনটিতে বড় দলগুলোর মধ্যে আধিপত্যের লড়াই চলে আসছে। সাচিং প্রু জেরী পাহাড়ের স্থানীয় রাজনীতিতে একজন প্রভাবশালী মুখ। বিএনপির হয়ে তার লড়াই মূলত পাহাড়ের মানুষের হারানো গণতান্ত্রিক অধিকার এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করার অঙ্গীকারকে কেন্দ্র করে। পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথে তার নির্বাচনী প্রচারণায় উঠে আসছে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং স্থানীয় কর্মসংস্থানের অভাবের কথা। অন্যদিকে, জাতীয় পার্টির আবু জাফর মোহাম্মদ ওয়ালিউল্লাহ দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক হওয়ায় তার সাংগঠনিক দক্ষতা কাজে লাগিয়ে লাঙ্গল প্রতীকের পক্ষে গণজোয়ার সৃষ্টির চেষ্টা করছেন। তার লক্ষ্য হলো বান্দরবানের অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং শিক্ষা খাতের আমূল পরিবর্তন আনা।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মাওলানা মো. আবুল কালাম আজাদ পাহাড়ের ধর্মীয় সম্প্রীতি এবং নৈতিক সমাজ গঠনের ওপর জোর দিচ্ছেন। পীর সাহেব চরমোনাইয়ের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি সাধারণ মানুষের মাঝে ইসলামী মূল্যবোধ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ডাক দিচ্ছেন। এনসিপির আবু সাঈদ শাহ্ সুজাউদ্দিনও পিছিয়ে নেই; তিনি নতুন ধারার রাজনীতির প্রতিশ্রুতি নিয়ে সাধারণ ভোটারের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন। পাহাড়ে ভোটারদের মধ্যে এখন প্রধান আলোচনার বিষয় হলো কে এই অঞ্চলের দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পারবেন।
বান্দরবানের আগামী নির্বাচনের প্রধান একটি অনুষঙ্গ হলো পর্যটন শিল্প। মেঘলা, নীলাচল, বগালেক আর সাজেকের মতো পর্যটন কেন্দ্রগুলো কেবল এ জেলার নয়, বরং দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে বিগত কয়েক বছরে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং নিরাপত্তার অভাবে পর্যটন খাত বেশ কয়েকবার ধাক্কা খেয়েছে। এবারের প্রার্থীরা সবাই তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে পর্যটন শিল্পের আধুনিকায়ন এবং পর্যটকদের জন্য নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। সাচিং প্রু জেরী তার বক্তব্যে উল্লেখ করছেন যে, পর্যটন বিকশিত হলে পাহাড়ের বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান হবে এবং জীবনযাত্রার মান বাড়বে। অন্যদিকে, আবু জাফর মোহাম্মদ ওয়ালিউল্লাহ পর্যটন কেন্দ্রগুলোকে আন্তর্জাতিক মানের করার পরিকল্পনা তুলে ধরছেন। পর্যটনের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় সংস্কৃতি রক্ষা এবং প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রাখাও এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
পাহাড়ি ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যকার সহাবস্থান এবং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক অধিকার রক্ষা এবারের নির্বাচনের অন্যতম বড় ফ্যাক্টর। ভোটাররা এমন একজন প্রতিনিধি চান যিনি পাহাড়ে শান্তি চুক্তি বাস্তবায়ন এবং ভূমি বিরোধ নিরসনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবেন। সাচিং প্রু জেরী এবং মাওলানা আবুল কালাম আজাদের মতো প্রার্থীরা বারবার জোর দিচ্ছেন যে, শান্তি বজায় না থাকলে উন্নয়ন সম্ভব নয়। ভোটারদের মতে, কেবল পাকা রাস্তা বা উঁচু দালান নয়, বরং মানুষের জানমালের নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক মুক্তিই আসল উন্নয়ন। বিশেষ করে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া এবং তরুণদের দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তোলা আগামী দিনের নির্বাচিত প্রতিনিধির জন্য বড় দায়িত্ব হবে।
নির্বাচন কমিশন এই আসনে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোটগ্রহণের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। বান্দরবানের দুর্গম এলাকাগুলোতে ভোট কেন্দ্র স্থাপন এবং ব্যালট বক্স পৌঁছানো এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাড়তি সতর্কতা এবং সব দলের প্রার্থীর প্রচারণায় সমান সুযোগ নিশ্চিত করার দাবি ভোটারদের মনে আস্থা তৈরি করছে। পাহাড়ের ভোটাররা সচেতন হয়ে উঠেছেন; তারা প্রতীক নয়, বরং যোগ্য ব্যক্তিকেই বেছে নিতে চান যারা বান্দরবানকে একটি আধুনিক, পর্যটনবান্ধব এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জেলা হিসেবে গড়ে তুলবেন।
পরিশেষে বলা যায়, বান্দরবানের ৩০০ নম্বর আসনে এবার চতুর্মুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। সাচিং প্রু জেরী, আবু সাঈদ শাহ্ সুজাউদ্দিন, মাওলানা আবুল কালাম আজাদ এবং আবু জাফর মোহাম্মদ ওয়ালিউল্লাহর মধ্যে কে সাধারণ মানুষের মন জয় করতে পারেন, তা দেখার অপেক্ষায় পুরো দেশ। পাহাড়ের বুক চিরে যে উন্নয়নের গান ধ্বনিত হচ্ছে, তার সফল সমাপ্তি ঘটবে একটি সফল নির্বাচনের মাধ্যমে। পর্যটনের অপার সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে বান্দরবান হয়ে উঠতে পারে দেশের শ্রেষ্ঠ জেলা, আর সেই লক্ষ্যেই এবার ভোটাররা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। আগামী দিনের বান্দরবান হবে শান্তি, প্রগতি এবং সমৃদ্ধির এক অনন্য প্রতীক।
–ছিদ্দিকুর রহমান



